Thursday, March 19, 2015

খিলাফত ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহ - ভূমিকা

খিলাফত ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহ - ভূমিকা

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতার অধীনে সম্পাদিত ‘আজহিজাতু দাওলিাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একাংশ হতে গৃহীত)

খিলাফত রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার আগে কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন :

১. ইসলামে শাসনব্যবস্থা বলতে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বুঝায়, যা এ মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত এবং যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান, খলীফা মুসলিমদের বাই'আতের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে থাকেন। এই বিষয়টির অকাট্য দলীল হচ্ছে আল্লাহ্‌'র কিতাব, রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌ এবং সাহাবীদের (রা) ইজ্‌মা (ঐক্যমত)।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুর'আনে বলেন:

"অতএব, আপনি আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে শাসন করুন এবং আপনার কাছে যে মহান সত্য এসেছে, তা পরিত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।" [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৮]

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরও বলেন:

"অতএব, আপনি আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে শাসন করুন, আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন; যেন তারা আপনার নিকট আল্লাহ্‌'র প্রেরিত কোন বিধান থেকে আপনাকে বিচ্যুত করতে না পারে।" [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৯]

রাসূল (সাঃ) এর প্রতি আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রদত্ত শাসন সংক্রান্ত এই নির্দেশনা তাঁর উম্মাহ্‌'র প্রতিও সমভাবে প্রযোজ্য। এর অর্থ হল উম্মাহ্‌কে অবশ্যই রাসূল (সাঃ) এর পরে এমন একজন শাসক নিযুক্ত করতে হবে যিনি আল্লাহ্‌'র কিতাব অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। উসূল-উল-ফিকহ্‌ (Islamic Jurisprudence) এর নীতি অনুসারে এই আদেশের ভাষা অকাট্য (Decisive)) যা থেকে বোঝা যায় যে, নির্দেশটি অবশ্য পালনীয় অর্থাৎ ফরয।

রাসূল (সাঃ) এর পর আল্লাহ্‌'র আইন দ্বারা মুসলিমদের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য যাকে নিয়োগ করা হবে তিনিই খলীফা। একইভাবে সেই শাসন পদ্ধতির নাম হল খিলাফত। এছাড়া, এ ব্যাপারে আরও যে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় তা হল, ইসলামী শরী'আহ অনুযায়ী আইনী শাস্তি বিধি-বিধান (হুদুদ) এবং অন্যান্য শারী'আহ আইন (আহ্‌কাম)

বাস্তবায়ন করা মুসলিমদের জন্য ফরয। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, একজন শাসক ছাড়া হুকুম-আহকাম বা শাস্তির বিধিবিধান কোনকিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। হুকুম শারী'আহ্‌'র মূলনীতি অনুযায়ী কোন ফরয বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত সমূহ যেহেত ফরয, সেহেতু ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কবার ব্যাপারে কর্ততৃশীল একজন শাসক নিযুক্ত করাও ফরয। এক্ষেত্রে, শাসক হলেন খলীফা এবং শাসন ব্যবস্থাটির নাম হল খিলাফত।

সুন্নাহ্‌ ভিত্তিক দলীল-প্রমাণের দিকে আমরা আলোকপাত করলে দেখতে পাই, আব্দুল্লাহ্‌ বিন উমর (রা) বলেছেন, "আমি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছি,

"যে আনুগত্যের শপথ (বাই'আত) থেকে তার হাত ফিরিয়ে নেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তার সাথে এমনভাবে সাক্ষাৎ করবেন যে, ঐ ব্যক্তির পক্ষে কোন দলিল থাকবে না এবং যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, যখন তার কাঁধে কোন আনুগত্যের শপথ নেই, তবে তার মৃত্যু হবে জাহেলি যুগের মৃত্যু।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫১)

রাসূল (সাঃ) প্রত্যেক মুসলিমের উপর বাই'আতের শপথকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। যে বাই'আত (আনুগত্যের শপথ) ছাড়া মৃত্যুবরণ করে তিনি (সাঃ) তার মৃত্যুকে ইসলামপূর্ব অজ্ঞানতার (জাহেলিয়াতের) যুগের মৃত্যু হিসাবে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সাঃ) এর পরে কেবলমাত্র খলীফাকেই বাই'আত দেয়া যায়। যেহেতু হাদীসটি প্রত্যেক মুসলিমের কাঁধে বাই'আতের শপথ থাকাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, তাই একইসাথে এ হাদীসটি মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিযুক্ত করাকেও বাধ্যতামূলক করেছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আল-আরাজ ও সেই সূত্রে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

"নিশ্চয়ই, ইমাম হচ্ছেন ঢাল স্বরূপ যার পেছনে থেকে মুসলিমরা যুদ্ধ করে এবং যার মাধ্যমে নিজেদেরকে রক্ষা করে।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৪১)

আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন যে, আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাঁকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

"বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সাঃ) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই'আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন।" (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৩৪৫৫; সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-৪৭৫০)

প্রথম হাদীসে খলীফাকে ঢাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে 'ঢাল' শব্দটি নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার প্রতীক হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে। মূলতঃ এ হাদীসে ইমামকে 'ঢাল' হিসেবে বর্ণনা করে ইমামের উপস্থিতির বিষয়টিকে প্রশংসা করা হয়েছে এবং সেইসাথে, ইমামের উপস্থিতির ব্যাপারে আহবান (তলব) জানানো হয়েছে। হুকুম শারী'আহ্‌'র নীতি অনুযায়ী যখন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে এমন কোন কাজের ব্যাপারে অবহিত করেন যার সাথে তিরষ্কার সূচক শব্দ ব্যবহৃত হয়, তখন ধরে নেয়া হয় যে মুসলিমদের সে কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বিপরীতভাবে কুর'আনের কোনও আয়াত বা রাসূলের (সাঃ) কোনও হাদীসে যদি কোনও কোন কাজের ব্যাপারে প্রশংসা সূচক শব্দ উল্লেখিত হয়, তবে ধরে নেয়া হয় যে, মুসলিমদের সে কাজটি করতে উৎসাহিত বা আদেশ করা হয়েছে। আর, এ কাজটি যদি আল্লাহ্‌'র কোন আদেশ বাস্তবায়নের জন্য অবশ্য পালনীয় হয় কিংবা, এ কাজে অবহেলা প্রদর্শন করলে যদি আল্লাহ্‌'র কোন আদেশ লঙ্ঘিত হয়, তাহলে এটি অকাট্য আদেশ (Decisive Command) বা অবশ্য পালনীয় কাজ হিসাবে গৃহীত হয়। এই হাদীসগুলো থেকে আমরা এটাও জানতে পারি যে, মুসলিমদের বিভিন্ন বিষয় দেখাশুনার দায়িত্ব হচ্ছে খলীফাদের - যা কিনা প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করার ব্যাপারটিকেই নির্দেশ করে। এছাড়া, আল্লাহ্‌'র রাসূল (সাঃ) মুসলিমদের খলীফার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং খলীফার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে কেউ তার সাথে বিরোধে লিপ্ত হলে তার সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা প্রকৃতঅর্থে একজন খলীফা নিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা ও তার খিলাফতকে যুদ্ধের মাধ্যমে হলেও রক্ষা করারই একটি নির্দেশ। আব্দুল্লাহ্‌ বিন আমর বিন আল আস (রা.) হতে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

"যখন একজন ইমামের হাতে বাই'আত গ্রহণ সম্পূর্ণ হয়ে যায় তখন তাকে যথাসাধ্য মান্য করবে, এমতাবস্থায় যদি কেউ তার সাথে বিরোধ করতে আসে (বাই'আত দাবি করে) তবে দ্বিতীয় জনকে হত্যা করবে।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং- ১৮৪৪)

অতএব, খলীফার আনুগত্যের আদেশটি প্রকৃতপক্ষে একজন খলীফা নিয়োগ করার আদেশ, কারণ একজন খলীফা উপস্থিত না থাকলে খলীফাকে মান্য করার আদেশটি রহিত হয়ে যায়। আর, যারা খলীফার সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হয় তাদের সাথে যুদ্ধ করার আদেশটি মূলতঃ একজন খলীফার উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার বিষয়ে বর্ধিত দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করে।

আর সাহাবীদের ইজ্‌মার বিষয়ে বলা যায় যে, তাঁরা (রা) রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর তাঁর (সাঃ) উত্তরাধিকারী হিসেবে একজন খলীফা নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা সকলেই আবু বকর (রা) কে রাসূল (সাঃ) এর উত্তরাধিকারী হিসেবে এবং আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে উমর (রা.) কে নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে একইভাবে, তাঁরা উসমান (রা) এর মৃত্যুর পর আলী (রা) কে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে নিয়োগ করেন। মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগের ব্যাপারে সাহাবীদের (রা) ঐক্যমত রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর পরপরই খুব জোরালোভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। আর, এ কারণেই তাঁরা (রা) রাসূল (সাঃ) এর দাফনকার্য সম্পাদন করার চাইতেও খলীফা নিয়োগের বিষয়টিকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যদিও তাঁদের প্রত্যেকেরই এটা জানা ছিল যে, যে কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর যত শীঘ্র সম্ভব তাঁর দাফনকার্য সম্পন্ন করা মুসলিমদের জন্য অবশ্য পালনীয় কাজ।

রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর সাহাবাদের (রা) উপর সর্বপ্র ম আল্লাহ'র রাসূল (সাঃ) এর দাফনকার্য সম্পন্ন করা ফরয ছিল; কিন্তু তা না করে তাঁরা (রা) মুসলিমদের প্রথম খলীফা নির্বাচনে ব্যস্ত ছিলেন। অন্যান্য সাহাবারা (রা) নীরব থেকে রাসূল (সাঃ) এর দাফন কার্য ২ রাত বিলম্ব করার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন, যদিও তাঁদের আল্লাহ'র রাসূল (সাঃ) এর দাফন কার্য শীঘ্রই সম্পন্ন করার সুযোগ ও সামর্থ্য ছিল। রাসূল (সাঃ) সোমবার সকালের শেষাধের্ ইন্তেকাল করলেন। কিন্তু, সেদিন সমস্ত দিন, এমনকি রাতেও তাঁকে দাফন করা হল না। মঙ্গলবার রাতে, আবু বকর (রা) কে বাই'আত দিয়ে খলীফা নিযুক্ত করার পর, আল্লাহ'র রাসূল (সাঃ) এর দাফন কার্য সম্পন্ন করা হল। সুতরাং, রাসূল (সাঃ) এর দাফন দুই রাত্রি বিলম্বিত হয়েছিল এবং তাঁর দাফন কার্য সম্পাদন হবার পূর্বেই আবু বকর (রা) কে বাই'আত দেয়া হয়েছিল।

সুতরাং, মৃতব্যক্তিকে দাফন না করে তার পূর্বে খলীফা নিয়োগে ব্যস্ত থাকার এই কাজটি সকল সাহাবাদের (রা) সম্মিলিত ঐক্যমতের (ইজমা আস-সাহাবা) একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যদি না মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক হত এবং মৃতব্যক্তির দাফন কার্য হতে খলীফা নিয়োগের ব্যাপারটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হত, তবে সকল সাহাবীরা (রা) সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ে কখনোই ঐক্যমতে পৌঁছাতেন না।

এছাড়া, মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা যে ফরয (বাধ্যতামূলক) এ ব্যাপারে সকল সাহাবাই (রা) সারাজীবন সম্মতি প্রকাশ করেছেন। যদিও কাকে খলীফা নির্বাচিত করা হবে এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল; কিন্তু একজন খলীফা যে নিয়োগ করতে হবে এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কোন মতবিরোধ ছিল না - হোক তা রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর কিংবা খোলাফায়ে রাশেদীনদের মৃত্যুর পর। সুতরাং, খলীফা নিয়োগের ব্যাপারে সাহাবাদের (রা) এই সম্মিলিত ঐক্যমত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা ফরয বা বাধ্যতামূলক।


পরবর্তী অংশ: খিলাফত এক অনন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা