Thursday, March 19, 2015

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ১২- চিন্তা (Thought) ও পদ্ধতি (Method) হিসেবে আদর্শের প্রতি আনুগত্য

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ১২

source: returnofislam.blogspot.com
(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

চিন্তা (Thought) ও পদ্ধতি (Method) হিসেবে আদর্শের প্রতি আনুগত্য

যখন পশ্চিমা কাফেররা তাদের জীবনব্যবস্থাকে এমনভাবে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হলো যাতে তা জনগণ অনুসরণ করে, তখন মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনযাপনগত অবস্থান কারও নিকট আর ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রইলো না। মুসলিমরা আক্বীদাহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ দ্বারা নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে লাগলো। উম্মাহ্ কখনও যেসব বিজাতীয় চিন্তাসমূহকে গ্রহণ করেনি, তা হতে উৎসারিত পশ্চিমা জীবনদর্শনের সাথে ইসলামী আক্বীদা’হ্ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টার ফলে মুসলিমরা তাদের সঠিক পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেললো। অজ্ঞতা ও সবকিছু নিজেদের ভিত্তি হতে গ্রহণের অক্ষমতাই এসব ভ্রান্তচিন্তা বিস্তার লাভের জন্য দায়ী। তারা ইসলাম এবং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ দুটি বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করলো। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে তারা শারীআহ্’র উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেললো। যেকোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে এবং যেকোন মনগড়া জিনিসের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। পরিণতিতে জনগণের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন পরস্পরবিরোধী বিষয়ে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুসলিমদের প্রকৃত চিন্তাগুলোকে মূল্যায়ন না করে বিজাতীয় চিন্তাসমূহের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হয়ে পড়লো।

এরকম এক প্রতিকূল পরিবেশে বিদেশী কাফিরদের কর্তৃক আকৃতি দেয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস, বিপথগামী আবেগের সমন্বয়ে গঠিত সম্প্রদায়কে মোকাবিলার লক্ষ্যে ইসলামী দল ও সংগঠনসমূহ যাত্রা শুরু করে।

এসবের প্রতিষেধক কিংবা নিরাময় এসব দল কিংবা সংগঠনের কাছে থাকা উচিত ছিল। জনগণকে দহনকারী বিভিন্ন বাঁকা পথের পাশে জনগণের অনুসরণীয় একটি সোজা পথনির্দেশনা উপস্থাপন করা উচিত ছিল। জনগণকে তাদের বলা উচিত ছিল,

“নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে।” [সুরা আনআম :১৫৩]

এসব দল কিংবা সংগঠন এমন যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল যা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। এসব যোগ্যতাসমূহ হচ্ছে চিন্তার স্বচ্ছতা, লক্ষ্য অর্জনের স্পৃহা, সচেতন একটি জনগোষ্ঠী প্রস্তুত করা, উম্মাহ্’কে প্রস্তুত করা এবং পদ্ধতি (method) সংক্রান্ত প্রতিটি হুকুমের প্রতি আনুগত্য।

দলটি চিন্তাকে (idea) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবে। দলের দৃষ্টিতে চিন্তা হচ্ছে সেই সত্য যার দিকে জনগণ ফিরে আসা উচিত, এবং এটা হচ্ছে পথনির্দেশ যা মানবজাতির চলার পথকে আলোকিত করবে। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমতস্বরুপ। এটা মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রবৃত্তিজাত চাহিদা থেকে বের করে নিয়ে আসবে। এটা মানুষের সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা মনকে ও আত্মাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। এটি জীবনে সুখ বয়ে আনে এবং আশা জাগায়। এতে রয়েছে সেই গভীরতা ও পরিপূর্ণতা যা জীবন সম্পর্কে মানুষের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সামর্থ্য রাখে এবং এই জীবনের আগের ও পরের বাস্তবতার সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করে। সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করে, ফলে মানুষ তার এই জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য কী তা উপলব্দি করতে সক্ষম হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক প্রশান্তিময় জীবনের স্বাদ পায়।

এই চিন্তা ধারণকারী দলটি এটাও বিশ্বাস করে যে যখন এই চিন্তা সমাজে বিদ্যমান থাকেনা তখন কোনোরকম বাধা ছাড়াই মুনকার ও মিথ্যাচার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করা শুরু করে, যুলুম সংঘটিত হয় এবং জাহেলিয়াত বিস্তার লাভ করে। তখন সংকীর্ণ এক কঠিন জীবন মানুষকে নিদ্রাহীন করে তুলে, তাদেরকে কখনোই সন্তুষ্ট চিত্তে পাওয়া যায় না। না তাদের আচরণ থাকে স্বাভাবিক কিংবা অন্তরে কোনো প্রশান্তি।

দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে হবে এর চিন্তার (ফিকরাহ্) দিকে মনোযোগ দেওয়া কারণ এটিই দলের আত্মা এবং তার অস্তিত্বের কারণ। এর যত্ন নেওয়া, বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং অন্যকিছুর মিশ্রণ থেকে একে রক্ষা করার জন্য দলটির কাজ করতে হবে। অন্যান্য বিজাতীয় কুফর চিন্তা যাতে এর সাথে মিশ্রিত হতে না পারে সে বিষয়টি দলকে নিশ্চিত করতে হবে এবং বিজাতীয় কুফর চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সকল আহ্বান ও ধারণা থেকে একে স্বতন্ত্র রাখতে হবে। চিন্তার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হলে দলটির নিকট তার লক্ষ্য (vision) পরিষ্কার থাকতে হবে। লক্ষ্যের (vision) স্পষ্টতার জন্য প্রয়োজন সঠিক ইজতিহাদ লব্ধ শারী’আহ্ হুকুম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান; এক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুমকে অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে হতে হবে।

চিন্তাগুলো (idea) যখন তার স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা এবং স্বাতন্ত্র্যতা হারিয়ে ফেলে তখন এটি নিজের বিশেষত্বও হারিয়ে ফেলে এবং এটা তখন আর আলোকবর্তিতা, হিদায়াত বা রহমত হিসেবে গণ্য হয়না। দলটি তখন নিজের অস্তিত্বে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলে এবং তথাকথিত অন্যান্য আন্দোলনের মতো হয়ে পড়ে; বাস্তবতার নিকট এমনভাবে পরাজিত হয় যে বাস্তবতাকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে নিজেই বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং বাস্তবতাকে যথার্থরূপে পরিবর্তন করার পরিবর্তে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। দলের কর্মীদের মধ্যে চিন্তাসমূহ (idea) যত স্বচ্ছ হবে ততই তা স্বচ্ছতার সাথে জনগণের নিকট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। চিন্তার (idea) স্বচ্ছতা থেকেই উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা লাভ করে। শারী’আহ্’র অন্যান্য হুকুমের মতো এই উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়াও শারী’আহ্’র বিভিন্ন হুকুম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

আদর্শিক দল সর্বাবস্থায় আদর্শের আনুগত্য করে। আর এই কারণে আদর্শিক ফিকরাহ্তে (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) বিশ্বাসী ও এর আহ্বানকারীদের এর অনুমোদন ব্যতীরেকে অন্য কোন উৎস থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। যেহেতু এটি একটি মৌলিক চিন্তা, সুতরাং এটি যেকোনো বিষয়কে তার গোঁড়া থেকে গবেষণা করে এবং মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র উত্তর প্রদান করে। ফলে জীবন সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের সমাধান এই মৌলিক চিন্তা থেকে গ্রহণ করা হয় এবং তা হতে উৎসারিত হয়। তখন মানুষের জীবনদর্শন, জীবনের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী এবং প্রতিটি কর্মকান্ডের মাপকাঠি তার জীবন সম্পর্কে মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যতা লাভ করে।

ইসলামের কাঠামোটি পূর্ণাঙ্গ এবং এতে এমনকি একটি ইটও ফাঁকা নেই। এর সবকিছু একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারণ এগুলো এমন এক অপরিবর্তনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি থেকে উৎসারিত যা মানবজীবনের স্বাভাবিক আচরণ এবং সৃষ্টি জগতের নিয়ম সম্মত।

সুতরাং ইসলামে বিশ্বাসীদের লাভ-ক্ষতির পরিবর্তে হালাল-হারামই হবে কাজের মাপকাঠি এবং প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী। কারণ লাভ-ক্ষতি সেই চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেই চিন্তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পরিবর্তে মানুষকে বিধানদাতা মনে করে। জীবনে সর্বোচ্চ ভোগ-বিলাসের সাথে একজন মুসলিমের সুখ সম্পৃক্ত নয় বরং তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টির সাথে সম্পৃক্ত। অবাধ স্বাধীনতার চিন্তা যা মানুষকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে তার বিপরীতে একজন মুসলিমের  জীবন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সার্বভৌমত্বের অধীন ও তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। ভিত্তিকে যদি কেউ গ্রহণ করে তাহলে তা থেকে উৎসারিত সবকিছুকে তার গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি পরিবর্তন চায় তাহলে ভিত্তি দিয়েই তাকে শুরু করতে হবে এবং সকল পারিপার্শ্বিক চিন্তাগুলোকে ভিত্তির সাথে সমন্বয় বিধান করতে হবে। এই হচ্ছে আদর্শিক ফিক্রাহ্ ও আদর্শিক দাওয়াত যা নিয়ে দলটিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। সুতরাং মুসলিমরা, তাদের ব্যবস্থাসমূহ কিংবা বিভিন্ন সংগঠন ইসলামের সাথে অন্যকিছুর মিশ্রণ ঘটাবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপভাবে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যদি অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি শারী’আহ্’কে একটি উৎস হিসেবে কিংবা শারী’আহ্’র পাশাপাশি অন্যান্য উৎসকে সংমিশ্রণ করে গ্রহণ করে তবে তাও গ্রহণযোগ্য হবে না। ইসলামী দলগুলো যদি ইসলামের বহির্ভূত পাশ্চাত্যের কুফর চিন্তাগুলোকে ইসলামের সাথে সংমিশ্রণ করে তাও গ্রহণযোগ্য হবেনা। এটা সুস্পষ্ট পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয় যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বান্দা তা কখনোই মেনে নেন না।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’-আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত ইবাদত বা আনুগত্যের যোগ্য অন্য কোনো সত্ত্বা নেই - এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী দলগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুনের জন্য পূর্ব কিংবা পশ্চিম কোনোদিকের দ্বারস্ত হওয়াই বৈধ নয়। সকল চিন্তাই যেন আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত হয়, এগুলো যেন নির্ভরযোগ্য শারী’আহ্ দলিলের আলোকে হয় এবং বিস্তারিত দলিলাদি থেকে ইজতিহাদপ্রসূত হয়, এসব বিষয়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটি কীভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ জীবন সম্পর্কে সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা- ‘সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই এবং জীবন নিছক বস্তুমাত্র’। গণতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটিও কীভাবে ইসলামে সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যেখানে এই ব্যবস্থাটি ‘দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথকীকরণ’, এই কুফর বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। অনুরূপভাবে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ ইসলাম থেকে এসেছে, এরূপ দৃষ্টিভঙ্গীও কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যেখানে গোত্রপ্রীতি থেকে জন্ম নেওয়া এসব চিন্তা ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য?

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত আর কোনো বিধানদাতা নেই, এই চিন্তাটি কীভাবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে আমাদের অংশগ্রহণ করা উচিত অথবা আমাদের সাথে অন্যদের অংশগ্রহণ করা উচিত এমন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?

বিশ্বজগতের প্রতিপালকের আনুগত্য, দাসত্ব ও ইবাদতের ধারণার উপরে প্রতিষ্ঠিত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ কীভাবে পাশ্চাত্য ব্যবস্থার স্বাধীনতার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, যা সকল বিষয়ে একমাত্র মানুষকে সার্বভৌম মনে করে? সে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ততটুকুই আত্মসমর্পণ করে যতটুকু তার খেয়াল-খুশী, ইচ্ছা ও স্বার্থের অনুকূল হয়।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলামে আক্বীদাহ্’কে রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে তা থেকে উৎসারিত সমস্ত কিছুকে রক্ষা করা। অন্যথায় সামঞ্জস্যতা বিধানের অতল গহ্বরে দলের চরিত্র তলিয়ে যাবে; যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর বান্দাগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না।

স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, স্বাতন্ত্র্যতা এবং স্বচ্ছতার দিক দিয়ে চিন্তাটিকে সংরক্ষণের জন্য একে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণের হাত থেকে দূরে রাখতে হবে এবং যেকোনো মিথ্যা, বিকৃতি ও বাগাড়ম্বরতা থেকে একে পবিত্র রাখতে হবে।

দাওয়াত বহনকারীগণ যেমন নিজস্ব লক্ষ্য অনুযায়ী সমাজ পরিবর্তন করতে চায় ঠিক তেমনিভাবে সমাজও তার নিজস্ব ভ্রান্ত ধারনা ও চিন্তা, রাজনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো আঁকড়ে রাখতে চায়, যা পরিবর্তন প্রত্যাশী সংগঠন এবং দাওয়াহ্ বহনকারীদের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে।

বিচ্যুতি ও আপোষের ব্যাপারে সতর্ক থাকা

কোনো আদর্শিক ফিকরাহ্’র (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) উপরে প্রতিষ্ঠিত দল যখন বাস্তবতার মোকাবিলা করতে মাঠে নামে তখন তার উপর অনেক ঝড়-ঝাঁপটা আসে এবং তাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে চায়। এই আন্দোলনটির প্রতি শাসকবর্গের আচরণ হবে অন্যান্য আন্দোলন থেকে পৃথক। কারণ অন্যান্য আন্দোলনগুলো আংশিক চিন্তা উপস্থাপন করে, যার ফলে তারা শাসকের জন্য মোটেও হুমকি হিসেবে কাজ করেনা। বরং শাসকবর্গ কর্তৃক সংঘটিত বিভিন্ন ত্রুটি ও অপূর্ণতার খালি জায়গাগুলো পূরণ করে দেয়। কিন্তু আদর্শিক ফিক্রাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত চরম আন্দোলনটি নিজস্ব ভিত্তির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের মোকাবিলা করে এবং কোনো জোড়াতালি দেওয়া সমাধানকে মেনে নেয়না অথবা পরিস্থিতির সাথেও তাল মেলায়না। না তারা কোনো আংশিক সমাধান মেনে নেয় আর না শাসকবর্গ কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যার সংস্কার করে। সামগ্রিক পরিবর্তন অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই দাওয়াহ্ ত্যাগ করাকে তারা মেনে নেয় না। না তারা ভিত্তিকে বাদ দিয়ে ভিত্তি থেকে উৎসারিত পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করাকে মেনে নেয়। ফলে এটা স্বাভাবিক এমন সংগঠনকে একটি নজিরবিহীন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুক্ষীন হতে হবে। সামগ্রিক পরিবর্তনের পথকে সংগঠনটি যত বেশী অনুসরণ করবে এর প্রতি শাসকগোষ্ঠীর শত্রুতা ও বিরোধীতাও তত বেশী জোরালো হবে।

এই বিরোধিতার তীব্রতার পরিমান এতো বেশীও হতে পারে যা সহ্য করার ক্ষমতা দাওয়াহ্ বহনকারীগণ মাঝেমধ্যে হারিয়ে ফেলতে পারেন। এবং দাওয়াহ্’র বক্তব্যের তীব্রতাকে খানিকটা হালকা করার জন্য সংগঠনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন। যখন সে প্রত্যক্ষ করবে সবাই তাকে ও তার এই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে তখন এই দাওয়াহ্ অব্যাহত রাখার কাজ তার নিকট অত্যন্ত কঠিন মনে হবে এবং তার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে যখন তার পার্থিব স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তখন সে নিজেকে প্ররোচিত করবে এবং কাজ ছেড়ে দিতে চেষ্টা করবে। তখন সে দলের উপর চাপ প্রয়োগ করবে যাতে দল পরিবর্তনের আহবানের পরিবর্তে সংস্কারের আহবান জানায়। দল যদি তার আহ্বানে সাড়া দেয় তাহলে সে দলে সাথে থাকবে। এভাবে নিজের দাবি অনুযায়ী সে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই কাজ করবে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও শাসকবর্গ উভয়কেই সন্তুষ্ট করবে। কিন্তু দল যদি তার এই চাপ প্রত্যাখ্যান করে দলের সামগ্রিক এবং মৌলিক কাজে অটল থাকে তাহলে সে দল ছেড়ে যাবে। অতএব, দল এক্ষেত্রে দুটো বিপদের সম্মুখীন হবে; একটি আভ্যন্তরীণ-যা আসবে সেসব শা’বাবদের তরফ থেকে যাদের মনোবল প্রচন্ড ঝড়-ঝাঁপটা আসার পূর্বেই ভেঙে পড়েছে এবং আরেকটি শাসকগোষ্ঠী তরফ থেকে যারা সামগ্রিক পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গী ধারণকারী দাওয়াহ্ বহনকারীদের সহ্য করতে পারে না।

একপর্যায়ে দল এবং শাসকবৃন্দের মধ্যে দরকষাকষি শুরু হবে। তখন দলের নিকট বিভিন্ন প্রস্তাব আসা শুরু করবে এবং ভয়-ভীতি আর প্রলোভন সমন্বিত একটি ‘মূলা ঝুলানো’ তত্ত্ব প্রয়োগ করা হবে। এটা সর্বজনবিদিত ব্যবসার ক্ষেত্রে দরকষাকষি প্রযোজ্য; সুতরাং দল যখন দরকষাকষিতে নামে তখন তা হয় তার দায়িত্বকে বিক্রি এবং উম্মাহ্’কে অপমানিত করার মতো অবস্থা। অন্যথায় একে শাসকগোষ্ঠীর আগুনে দগ্ধ ও তার শিখায় ঝলসাতে হয়।

অতএব, সঠিক আদর্শিক ফিকরাহ্ এমন একটি আদর্শিক দলের দাবি করে যার নেতৃত্ব এবং সদস্যগণ শারী’আহ্’র কর্তৃত্বকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, ধৈর্য, ত্যাগ স্বীকার, পরার্থবাদ এবং এ সমস্ত বিষয়েও তারা সচেতন। পরিণতির আশংকায় যে কোন প্রলোভনের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া থেকে তাদের অবশ্যই তাদেরকে বিরত থাকতে হবে যাতে তারা বিচ্যুত হয়ে না পড়ে এবং তাদের মনোবল না ভেঙে যায়। দলটি যদি এমন একটি সুরক্ষিত পদ্ধতিতে অগ্রসর হতে চায় যাতে তার কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং কোনোরূপ পরিবর্তনের জোয়ারে ভেসে না যায় অথবা দলটিকে নিয়ে লোকজন কোনোরকম খেলায় লিপ্ত হতে না পারে, সেজন্য দলটিকে অবশ্যই প্রতিটি চিন্তাকে বা শারী’আহ্ হুকুমকে দৃঢ়ভাবে ইসলামী আক্বীদাহ্’র সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যদি কখনো লক্ষ্য অর্জনের পথে দাওয়াত বহনকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সুবিধার সাথে দাওয়াহ্’র দৃঢ়তা ও ধৈর্য্যরে সংঘাত বাঁধে তাহলে অবশ্যই দাওয়াহ্’কে সর্বাবস্থায় প্রাধান্য দিতে হবে। যার ফলে তখন এই চিন্তাটি দুষ্কর্মের দিকে ধাবিতকারী শয়তান ও নফসের প্ররোচনার পথে একটি দূর্বেধ্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।

কাঁদার মধ্যে সংগঠনটির তরী ডুবে যাওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক পরিণতির হাত হতে বাঁচাতে হলে, তার নিকট নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় কিছু মূলনীতি বিদ্যমান থাকতে হবে যা দলের চিন্তা ও চিন্তার প্রক্রিয়াকে নির্ধারণ করবে। যা দলটিকে তার গৃহীত হুকুম শারী’আহ্’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। নতুন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নের নামে এসব মূলনীতি থেকে সে কখনোই বিচ্যুত হতে পারবে না।

ফলে সঠিক নির্দেশনা, সঠিক অনুসরণ এবং সঠিক জ্ঞান দলটিকে পরিশুদ্ধ করবে এবং দলের সদস্যদের অন্তরকে যেকোনো ক্রটি-বিচ্যুতি এবং দোষ থেকে মুক্ত করবে এবং তাদের ঈমানকে মজবুত করবে।

এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী মুমিনগণ ছাড়া আর কারও পক্ষে দৃঢ় থাকা অসম্ভব। এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুক্ষীন হওয়ার পর যারা টিকে রইবে, তাদের ঈমান সেইভাবে খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হবে যেভাবে আগুন দ্বারা সোনা খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হয়।

দল যখন তার গৃহীত নিয়ম নীতিমালাকে হারিয়ে ফেলে তখন সে কর্মসূচী প্রত্যাহার, রদবদল, পিছু হটা, অসঙ্গতিতে ভুগবে। পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা কঠিন পরিস্থিতিতে কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সংগঠনকে পরিবর্তন সাধনে তাড়িত করে অথবা জনগণের নিকট দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের পক্ষে ন্যায্যতা কিংবা শারী’আহ্’র বাইরে গিয়ে ব্যাখ্যা উপস্থাপনের দিকে ধাবিত করে।

দল যখন আপোষ করবে, সত্যকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ না করে আংশিকভাবে গ্রহণ করবে এবং সামগ্রিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা ও মৌলিক কাজকে পরিত্যাগ করবে তখন সে তার ধারণকৃত একমাত্র শক্তিকে হারিয়ে ফেলবে। তখন সে আর কোনো অনন্য ও স্বতন্ত্র দল হিসেবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে সে পরাজিত হবে এবং শত্রুপক্ষ বিজয়ী হবে যদিও তখন সে ইসলামের দিকে আহবান করে এবং ইসলামকে একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করে। এর কারণ তার আহ্বান বিকৃত এবং প্রচলিত ব্যবস্থার জন্য সুবিধাজনক হয়ে গেছে। এবং পরিবর্তনের রাস্তায় সহযোগী হওয়ার পরিবর্তে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। এই ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, রাসূল (সাঃ) এবং রাসূল (সাঃ) পরবর্তী উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন:

...এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।” [সুরা মায়েদা: ৪৯]

তাছাড়া সাইয়্যিদুনা উমর (রাঃ) তার নিযুক্ত বিচারক শুরায়হ্’কে বলেছেন: “কেউ যাতে তোমাকে নির্ধারিত এ পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।”

দলের মধ্যে বিদ্যমান সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হচ্ছে তার ফিকরাহ্ (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ)। যদি দল একে সংরক্ষণ করে এবং আপোষের পরিবেশ থেকে রক্ষা করে, পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে এর উপরে অটল থাকে এবং রাসূল (সাঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাহলে রাসূল (সাঃ) এর মতো তারাও মুমিনদের একটি দল প্রস্তুত করতে পারবে এবং আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে উম্মতকেও রাজি করাতে পারবে। এসব বিষয় প্রস্তুত করার পরে সে পরিস্থিতিকে দাওয়াহ্’র অনুকূলে নিয়ে আসতে পারবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

ইসলামী চিন্তাসমূহ সত্যের দাওয়াহ্ বহনকারী ব্যক্তিদের জন্য এমন এক নিয়ামত যা তাদেরকে পরিস্থিতি কর্তৃক সৃষ্ট চাপ মোকাবেলায় আসল মৌলিক চিন্তাসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইসলামী চিন্তাসমূহের উপর অটল থাকার দাবি জানায়। পরিস্থিতি সৃষ্ট চাপের মুখে- ‘চাহিদানুযায়ী সবই গ্রহণযোগ্য’, ‘ততটুকুই উপস্থাপন কর যতটুকু বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ’, ‘দাবির আংশিক উপস্থাপন কর’, ‘আংশিক সমাধান গ্রহণ কর’- এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করা দলের জন্য কোনভাবেই মানানসই না। এসব চিন্তাকে ব্যবহার করা নয় বরং এগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এগুলো পাশ্চাত্যের চিন্তার ধরণ যা দ্বারা তারা আমাদের চিন্তার উপর আগ্রাসন চালিয়েছে। এসব চিন্তার সাথে সামগ্রিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারী ইসলামী চিন্তা এসব কুফর চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে ও এগুলোকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য কাজ করছে, এবং ইসলাম ও ইসলামের চিন্তার প্রক্রিয়া বলবৎ করার জন্য কাজ করছে। অতএব যে পরিবর্তন চায় এবং পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে তাকে অবশ্যই প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হবে।

ফিকরাহ্’র বিশুদ্ধতা ও স্পষ্টতার উপরে জোর দিতে এবং তা বজায় রাখতে কোন কোন বিষয়ের দিকে দলটিকে নজর দিতে হবে সেগুলো উপস্থাপনের পর এবার আমরা পাশ্চাত্যের কাফিরদের কর্তৃক প্রস্তাবিত দুটি চিন্তা নিয়ে আলোচনা করব। এসব চিন্তার প্রতি আমাদের শাসকবর্গ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এগুলোর মাধ্যমেই তারা মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালায়। দুর্ভাগ্যবশত ইসলামের জন্য কাজ করে এমন কিছু ইসলামী দল এবং পাশ্চত্য চিন্তা গ্রহণের জন্য সবসময় উৎসাহ যোগায় এমন কিছু মুসলিম লেখক এসব চিন্তাকে দ্রুত গ্রহণ করে ফেলেছে। চিন্তা দুটির মধ্যে একটি হচ্ছে গণতন্ত্র এসেছে ইসলাম থেকে এবং গণতন্ত্রই শূ’রা। এমনকি শব্দের পুনর্মিলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দরুন একজন লেখক একে শূ’রাক্রেসি বা শূ’রাতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। অপর চিন্তাটি হচ্ছে কতিপয় মুসলিম এবং ইসলামী আন্দোলন কর্তৃক কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করার পক্ষে সাফাই গাওয়া। উপরোক্ত আলোচনাটিতে অগ্রসর হওয়ার শুরুতেই আমরা যেসব মূলনীতি উল্লে¬খ করেছি তার আলোকে আমরা যাচাই করবো কোন বাস্তবতায় গণতন্ত্র প্রয়োগযোগ্য, গণতন্ত্রের বাস্তবতা কী এবং শারী’আহ্’তে এমনকোনো বাস্তবতা আছে কিনা যা গণতন্ত্রের বাস্তবতার সাথে সদৃশপূর্ণ।

গণতন্ত্র:

পশ্চিমা সভ্যতা দুনিয়া থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই চিন্তা ও ভিত্তিতে বিশ্বাসের দরুণ পশ্চিমারা জনগণের জীবন থেকে দ্বীনের প্রতিটি প্রভাব বিনষ্ট করেছে। এর অনুকরণে তারা মৌলিক চিন্তার আদলে এর উপর ভিত্তি করে জীবন সম্পর্কিত সকল চিন্তা ও সমাধান বিকশিত করেছে। অতএব গণতন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কর্তৃত্বের পরিবর্তে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে নিজেদের কাজের মাপকাঠি হিসেবে তারা স্বার্থকে গ্রহণ করলো এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ঈন্দ্রীয়গত পরিতুষ্টিকে সুখ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলো। এটাই ছিল ব্যক্তিপূঁজার চিন্তা পরবর্তীতে ব্যক্তিস্বাধীনতার পূঁজার দিকে ধাবিত করে। এসব চিন্তার উপরে ভিত্তি করেই পাশ্চাত্য সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি এসব চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক সকর চিন্তার বিরোধিতা করেছে। এসব চিন্তা গ্রহণের ফলে নিজেদের সন্ধানকৃত সুখের পরিবর্তে পাশ্চাত্য কেবল দুর্ভোগেরই শিকার হয়েছে। এরূপ ঘটাই স্বাভাবিক কারণ মানুষ হচ্ছে দুর্বল যে নিজের বা অন্যের জন্য আইন প্রণয়নের যোগ্যতা রাখেনা। যে সমাজে স্বার্থপরতা প্রবল থাকে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার কর্তৃত্ব থাকে সেরকম একটি সমাজ কেবল পাশবিকই হতে পারে যেখানে জংলী আইনকানুনের রাজত্ব থাকে।

এরপর পশ্চিমারা মনকে স্বাধীন রাজত্ব প্রদান করলো। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তারা মনোনিবেশের ফলে তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করলো। এভাবে যখন সে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলো তখন পৃথিবীর উপর সে সত্যের জোরে নয় বরং ক্ষমতার জোরে আধিপত্য বিস্তার করলো। প্রথমে বস্তুগতভাবে ও পরবর্তীতে বুদ্ধিবৃত্তিভাবে সে নিজেকে পৃথিবীর উপর চাপিয়ে দিল। অন্যভাবে বলতে গেলে, একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা প্রথমে এমন শাসকবর্গকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলো যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং সেজন্য উপযোগী ব্যবস্থাও আরোপ করবে। এমন মিডিয়া ও পাঠ্যসূচী প্রতিষ্ঠা করলো যা তাদের চিন্তা ও জীবনব্যবস্থার পক্ষে প্রচারণা চালাবে। জনগণকে তারা উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করলো যে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী তাদেরকে ক্ষমতাধর অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে।

তখন সে নিজের স্বার্থের অনুকূলে পুরো পৃথিবীকে বিভক্ত করে ফেললো। শিল্পোন্নত, উৎপাদনশীল, শক্তিশালী, আধিপত্যবাদী এবং ঔপনিবেশিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে তারা আধুনিক ও প্রগতিশীলদের কাতারে ফেললো। এবং অবশিষ্ট দরিদ্র, পরনির্ভরশীল, দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোকে তারা পশ্চাৎপদদের কাতারে ফেললো। এই বিভক্তিকে আরও গভীর করা, এবং এসব রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি কিংবা চলমান পরিস্থিতি অসঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো পরিবর্তনের চেষ্টাকে প্রতিরোধ করলো।

তারপর তারা নিজেদের দেশে ব্যক্তিস্বাধীনতার দরজা খুলে দিল এবং জনগণকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উপভোগের সুযোগ করে দিল। বৈষম্য বজায় রেখে জনগণকে মৌলিক চাহিদা ও পাশাপাশি ভোগবিলাসের চাহিদা পূরণের সুযোগ করে দিল। একই সময়ে এসব দরিদ্র দেশসমূহ যাতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বস্তুগত উন্নতি সাধন করতে না পারে এজন্য তারা এসব জাতিকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হতে বঞ্চিত রাখলো। মৌলিক শিল্প কাঠামো গড়তে বাঁধা প্রদান করেছে যাতে অতি প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদার জন্যেও এসব দেশকে পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। এসব দেশকে দুর্বল করার মাধ্যমে তারা এগুলোকে নিজেদের বাজারে পরিণত করলো। এসব দেশের জনগণকে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করলো। আর এজন্যেই শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে নিজেদের উপনিবেশ বানাতে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এই দ্বন্দ্ব আবার এ পর্যায়ের না যে তাদের একে অপরের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত। বরং তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের পরিণতি হচ্ছে এসব দরিদ্র দেশের জনগণ একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত, অথবা ঐ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনহীন বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও বিপ্লবের উৎপত্তি। ফলে এসব রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জনগণের ভিতরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। না বললে নয় যে এর মাধ্যমে তারা এসব দেশের জনগণের ভেতর বর্ণবাদ, গোত্রবাদ এবং জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়েছে।

অনুরূপভাবে, পাশ্চাত্য দেশসমূহ নিজেদের জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা যেমন ঔষধ, শিক্ষা, বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা প্রভৃতি বিষয় সরবরাহ করেছে অথচ অন্যান্য দেশে এসব বিষয়কে নিষেধ করেছে।

উপনিবেশীকরণের বিভিন্ন উপকরণ হিসেবে পাশ্চাত্য কিছু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান যেমনঃ আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামানোর জন্য অথবা দরিদ্র দেশগুলোতে দেওয়া ত্রাণের নিরাপত্তার জন্য তারা আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনী গঠন করেছে। গরিব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যেমন সেভ দি চিলড্রেন এবং মেডিসিন সানস ফ্রন্টিয়ারস প্রতিষ্ঠা করেছে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ এবং এ থেকে উদ্ভূত স্বার্থের ধারণা থেকে পাশ্চাত্য উপনিবেশকরণের ধারণা প্রবল হয়েছে। তবে এই উপনিবেশীকরণ বর্তমানে তার আদিম চেহারায় আর নেই। বরং তা চিন্তা, উপকরণ ও ধরণ পাল্টে এক গুপ্ত উপনিবেশবাদে পরিণত করা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এটি করুণা এবং ভিতরগতভাবে যুলুম। এভাবেই পশ্চিমারা বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং নিজেদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে জনগণ তাদেরকে একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ বলে ভাবতে শুরু করে এবং মুসলিমরা তাদেরকে কিবলা বানিয়ে মাথানত করে। তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার চিন্তা থেকে এরূপ দাবি করার মতো বড় প্রতারণা এবং মুনাফিকী আর কী হতে পারে? পাশ্চাত্যের পছন্দকৃত স্বর্গে (?) যারা বাস করতে চায় তাদের জন্য পাশ্চাত্য হচ্ছে আশ্রয় ও করুণা। পাশাপাশি উপনিবেশিকতাবাদের প্রকৃত চেহারা যা হচ্ছে জনগণকে শোষণ করা ও তাদের সম্পদ অন্যায়রূপে দখল করা, তাদেরকে দুর্বল করে রাখা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদেরকে পশ্চাৎপদ করে রাখা, নিজেদের সম্পদের জন্য তাদেরকে স্থায়ী বাজারে পরিণত করা এবং পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের যে কারণ সেগুলোকে তারা গোপন করেছে। পাশ্চাত্যের সভ্যতা এবং এর উপনিবেশিকতাবাদের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, আলোচনার সুবিধার্থে যার কিছু অংশ আমরা উপস্থাপন করেছি মাত্র।

হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই পশ্চিমারা সত্যকে বিকৃত করেছে, বিষয়বস্তুকে উল্টে ফেলেছে এবং নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন বিষয়কে জনগণের প্রকৃত উপলব্ধি থেকে অন্ধকারে রেখেছে। ফলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা জনগণকে প্রভাবিত করতে লাগলো, যার মধ্যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ অন্যতম। শ্লোগাণটি ‘শক্তিশালীর যুক্তি শক্তিশালী’ এবং ‘দুর্বলের যুক্তি দুর্বল’ এই মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আদর্শিক দল বা গোষ্ঠীর মূল ভূমিকা এখানেই যাতে সবকিছুই তার প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসে, দৃষ্টিভঙ্গী ঠিক হয় এবং প্রতারণা বন্ধ হয়। দল যদি বাস্তবতা দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সে সঠিক উপলব্ধি হারিয়ে ফেলবে এবং এমন সমাধানের প্রস্তাব দিবে যা সাধারণত তার শত্রুরা দিয়ে থাকে। তবে দল যদি বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং সমাধান খুঁজতে সঠিক প্রক্রিয়ায় শারী’আহ্’কে অনুসরণ করতে পারে তাহলে জনগণের সামনে সে সঠিক সমাধান উপস্থাপন করতে পারবে এবং জনগণকে পাশ্চাত্যের নষ্ট চিন্তা থেকে ইসলামের আলোকিত চিন্তায় আনতে সক্ষম হবে।

উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে বিভিন্ন দেশকে বস্তুগত অগ্রগতির উপকরণ অর্জনে বাঁধাপ্রদান এবং নিজেদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জ্ঞানচর্চার ব্যাপক স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে পশ্চিমারা তাদের ক্ষমতাধর অবস্থা ধরে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের পিছনে গণতন্ত্র নয় বরং দায়ী হচ্ছে তাদের ঔপনিবেশিকতাবাদ, বিভিন্ন জাতিসমূহের রক্তশোষণ এবং সম্পদ লুণ্ঠন।

আর গণতন্ত্র কী ও তা বাস্তবায়নের পরিণতি কী; তা এক ভিন্ন আলোচনা।

পাশ্চাত্যে ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ - এই ধারণাটি জন্ম হয়েছে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে চার্চের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগের কারণে। এসব হস্তক্ষেপ ধর্মের নামে চালানো হলেও এসব ব্যাপারে ধর্মের কোনো মন্তব্য ছিলনা। কারণ খ্রিস্টান ধর্মে পার্থিব বিষয়সমূহের জন্য কোনো আইনকানুন নেই। ধর্মের নামে পাদ্রীগণ বিভিন্ন অন্যায় আইনকানুন তৈরি করেছিল যার ফলে কিছু বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়; এর মধ্যে একটি ছিল ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা এবং অন্যটি ছিল ধর্মকে স্বীকার করা কিন্তু জীবন থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রথম প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে এর শাসনে জনগণ পিষ্ট হয় এবং কয়েক দশক যেতে না যেতে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে যা ধ্বংসের পথে এগুচ্ছে। যার নমূনা চিন্তা এবং বাস্তবতার নিরিখে সুস্পষ্ট।

‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’-এই ধারণাটি ধর্মকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে মানুষকে আইন প্রণয়নের অধিকার দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে স্বীকার করে নেয়া সত্ত্বেও তারা একে এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিণত করেছে যাতে এর কোন বক্তব্য কিংবা প্রভাব সমাজের উপর না পড়ে। সমাজের বিষয়ে যার কিছু বলার নেই এবং যা সমাজে কোনো প্রভাবও রাখতে পারবেনা। তাদের জন্য এটা ভুল নয় যদি কেউ আল্লাহ্, যীশু, বুদ্ধ বা অন্য কোন ব্যক্তির উপাসনা করে। এমনকি ধর্ম হতে উদ্ভুত নয় এমন বিশ্বাসে কেউ বিশ্বাসী হওয়াটাও তাদের দৃষ্টিতে দোষের নয়। কিন্তু সর্বদা মানুষকে সকল বিষয়ের একমাত্র ব্যবস্থাপক মানতে হবে। তাদের দৃষ্টিতে এ বিষয়টির সাথে কোন আপোষ-আলোচনার সুযোগ নাই। তাদের মতে মানুষ নিজেই নিজের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা করবে এবং তার প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্টির ব্যবস্থা করবে। এ চিন্তা থেকে গণতন্ত্রের ধারণা উদ্ভুত হয়েছে যার অর্থ ‘জনগণের শাসন, জনগণের দ্বারা শাসন এবং জনগণের জন্য শাসন।’

‘জনগণের শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ নিজেই নিজের প্রভূ অর্থাৎ আইন তৈরি করবে অর্থাৎ বিধানদাতা।
‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন দ্বারা শাসন করবে।
এবং ‘জনগণের জন্য শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন কর্তৃক শাসিত হবে।

তাদের মতে তিন ধরনের কর্তৃপক্ষের আবির্ভাব ঘটে,

১. আইন তৈরির জন্য কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ আইন ও কানুন তৈরি, এগুলো সংশোধন, রহিতকরণ এবং প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ  করে।
২. নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ সাধারণ আইন বা জনগণের সাধারণ ইচ্ছা ও আইন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আইন প্রয়োগ করে।
৩. বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য কর্তৃপক্ষ। এটি আইনী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আইন ও কানুন দ্বারা তার সামনে উত্থাপিত যে কোন বিষয়ের বিচারকার্য সম্পাদন করে।

এগুলো হলো গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা বলা সম্ভবপর যে, অন্যদের থেকে পার্থক্যকারী এই রকম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আদর্শের নামই হল গণতন্ত্র। এর যে কোনটি বাদ পড়েছে এমন কোন ব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র নয়। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। একে গণতান্ত্রিক চিন্তার প্রাথমিক অবলম্বন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সুতরাং ইসলামে কি গণতন্ত্র আছে? গণতন্ত্রের এ উপরিল্লিখ বৈশিষ্ট্য কি ইসলামে বিদ্যমান? যদি এ বাস্তবতা ইসলামে বিদ্যমান থাকে তখনই আমরা বলতে পারি, ‘গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে’ এবং ‘খোলাফায়ে রাশেদীনগণ সর্বপ্রথম গণতন্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন’ এবং ‘গণতন্ত্র হলো সে হারানো সম্পদ যা পুনরায় আমাদের কাছে ফিরে এসেছে?’ আর যদি তা বিদ্যমান না থাকে তাহলে গণতন্ত্র মোটেও ইসলাম থেকে আসেনি। কাজেই আমাদেরকে অবশ্যই গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের মতামত জানতে হবে।

নিশ্চয়ই গণতন্ত্র সেই মতাদর্শের ভিত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে মতাদর্শের ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ। এ ভিত্তি হতে গণতন্ত্র জন্ম লাভ করেছে এবং একই আইন গ্রহণ করেছে। এটি পরিত্যাজ্য একটি ভিত্তির শাখা, এবং এই ভিত্তির উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী কাফের হিসেবে গণ্য। এটা সর্বজনবিদিত, ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ মুসলিমদের মৌলিক বিশ্বাস ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ এর পরিপন্থী। মুসলিমদের জন্য আক্বীদা হতে উদ্ভুত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা হচ্ছে:

“নিশ্চয় আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ব্যতীত আর কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না। [সূরা ইউসুফ: ৪০]

তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) বক্তব্যের

...কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না।” এর অর্থ হল সারা জাহানের প্রভূর প্রদত্ত হুকুমের ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকের মতামতের কোন মূল্য নেই এবং আইন তৈরির ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র। সুতরাং ইসলামী ব্যবস্থায় সর্বশেষ কথা কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য। আদেশ, নিষেধ, অনুমোদন, নিষিধাজ্ঞা প্রদান কেবলমাত্র সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে মহান, সর্বজ্ঞানী, সব বিষয়ে প্রাজ্ঞ সত্ত্বার জন্য; এছাড়া আর কারও জন্য নয়। কোন ব্যক্তি বা দলের আল্লাহ্’র সাথে এ ব্যাপারে সামান্যতম হিস্যাও নেই।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হলেন সে সত্ত্বা যিনি রায় দিয়েছেন,

নিশ্চয়ই আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্।” [সূরা ইউসুফ: ৪০]

এবং আল্লাহ্’র রায়ের ব্যাত্যয় ঘটানোর অধিকার কারও নেই,

তার নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই”। [সূরা রা’দ: ৪১]

তাহলে কী করে গণতন্ত্রের কালো রাত্রির সাথে ইসলামের জ্যোতিময় দিনের তুলনা চলে? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর সুস্পষ্ট আয়াতে উল্লেখ করেছেন,

আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর কথাবার্তা বলে।”  [সূরা আল আনআম: ১১৬]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

“...হয়তো তোমরা এমন বিষয়কে অপছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যানকর এবং এমন বিষয়কে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। এবং আল্লাহ্ জানেন কিন্তু তোমরা জানো না।”   [সূরা বাক্বারা: ২১৬]

তাগুত কী?

ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও নিকট শরণাপন্ন হওয়াকে তাগুতের নিকট শরণাপন্ন হওয়া বুঝায়।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার উপর নাযিল হয়েছে, এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, তার উপর তারা ঈমান এনেছে, এবং তারা বিবাদমান বিষয়গুলোর মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায় অথচ তা প্রত্যাখ্যানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” [সূরা আন নিসা: ৬০]

তাগুতের শাসন মানেই জাহেলিয়াতের শাসন। এর প্রতিটি আইন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে আল-কাইয়্যিম তার রচিত গ্রন্থ ই’লাম আল-মুয়াক্কি’ঈন এ বলেন, “বান্দা যখন কোনকিছুর ইবাদত, কাউকে অনুসরণ কিংবা মান্য করার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে তখন এইরকম প্রতিটি কর্মকান্ডই তাগুতের মধ্যে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য তাগুত সেটাই যার নিকট সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচারের শরণাপন্ন হয়, অথবা আল্লাহ্ বাদ দিয়ে যার উপাসনা করা হয়, অথবা আল্লাহ্’র কাছ থেকে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে যার অনুসরণ করা হয়, অথবা এমন কিছুকে মান্য করা যা আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্য থেকে উৎপত্তি হয়নি।”

যে তাগুতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে তার ঈমান কোনো বাস্তবতা নয় বরং নিছক দাবী বা ভন্ডামী মাত্র। এছাড়াও কুর’আন তাগুতকে ঈমানের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছে যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

“যে তাগুতকে অবিশ্বাস করলো এবং আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো, সে এমন সুদৃঢ় হাতলকে ধারণ করলো যা ভাঙবার নয়।” [সূরা বাক্বারা: ২৫৬]

সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর মৃত্যুর পর, ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ্’কে অবশ্যই মানবজাতির স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সে কারণে কুর’আন যা বলেছে, ঠিক তাই এ উম্মাহ্’র মানবতাকে বলা উচিত,

“একমাত্র আল্লাহ্’র ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।” [সূরা নাহল: ৩৬]

সুতরাং জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের চিন্তা, এবং তা থেকে উৎসারিত সকল চিন্তা, যেমন গণতন্ত্র তাগুতের চিন্তা। ইসলাম আমাদেরকে তা প্রত্যাখান ও পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছে।

এটাই হলো গণতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী। আর এগুলো পৃথিবীতে বাস্তবায়নের ফলে যে ফলাফল তৈরি হবে তা কী এমন সম্মানজনক ও সুন্দর ব্যবস্থা হবে যার ছায়াতলে মানুষ বসবাস করতে পছন্দ করবে নাকি এমন মন্দ ব্যবস্থা হবে যার প্রয়োগে মানুষ অন্তঃসারশূন্য ও ক্ষতিকারক জীবনে পতিত হবে এবং তার আগুন দ্বারা নিয়ে দগ্ধ হবে?

পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে পশ্চিমারা নিজেদেরকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করেছে। এটা এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে মানুষ অন্যের তোয়াক্কা না করে এমন জীবনযাপন করবে যাতে সে নিজেকে পরিতুষ্ট করতে পারে; যেখানে তার নিজের খেয়ালখুশীর প্রতিফলন ঘটবে কিন্তু অন্যদের নয়। তারা মনে করে মানুষ এরূপ অধিকার ভোগ করতে পারবে না যদি না সে স্বাধীন হয়। আর এটা থেকেই পাওয়া যায় বিশ্বাস, মালিকানা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা। এটা স্বাধীনতার এ ধারণাকে পবিত্র বলে বিবেচনা করে। এই স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অর্থ রয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা একজনকে পছন্দসই ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। অথবা দৈনন্দিন ব্যাপার হলেও তাকে এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হওয়াকে অনুমোদন দেয়। এমনকি এটা তাকে ধর্ম পুরোপুরি পরিত্যাগ করতেও সুযোগ দেয়।

মালিকানার স্বাধীনতা তাকে যে কোন কিছুর, যে কোনভাবে মালিক হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। এমনকি এটা তাকে তার সম্পত্তি যেভাবে খুশী সেভাবে হস্তান্তর বা পরিত্যক্ত করবার স্বাধীনতা দেয়। যদি এটি সে তার উত্তরাধিকারকে না দিয়ে প্রিয় পোষা কুকুরকে উপহার হিসেবে দিতে চায় তাহলে কেউ তাতে বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে খেয়ালখুশী মতো, অবাধে ও নিয়ন্ত্রনহীনভাবে সবকিছু বলবার স্বাধীনতা প্রদান করে, হোক সেটা সত্য বা মিথ্যা। তার উপলদ্ধি এবং খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে যায় এরকম যে কোন মতামতকে সে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করতে পারে।

ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে তারা ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন মূল্যবোধ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আধ্যাত্মিক সীমারেখার দ্বারস্থ হয় না।

গণতন্ত্রের মৌলিক অপরিহার্যতা স্বাধীনতার এই ধারণা এর পক্ষালম্বনকারীদের এমন এক বোধের দিকে নিয়ে গেছে যা তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম করে দিয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের উপর বিশ্বাসের গুরুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। তাদের পোষাক পরিবর্তনের মতো ধর্ম পরিবর্তনকে সহজতর করে দিয়েছে। বস্তুবাদী চিন্তার প্রসার ও ধর্মীয় চিন্তাকে গন্ডীভূত করে ফেলবার কারণে নৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একারণে লোকদের হৃদয় থেকে সমবেদনা উঠে গেছে এবং নেকড়ের মত দূর্বলের উপর সবলের আধিপত্য চলছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশী বলতে পারে এবং যে কোন কিছুর দিকে লোকদের আহ্বান করতে পারে। সে কারণে তাদের সমাজে সব ধরণের অদ্ভুদ, মিথ্যা, খ্যাঁপাটে ধরণের মতামতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যে কোন সাধারণ লোক রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং তাকে বিরত করার কোন আইন নেই। যেমন: সালমান রুশদী, যে বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

মালিকানার স্বাধীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাভ এবং এটা পুঁজিবাদের মধ্যে ভয়াবহতা তৈরি করেছে ও লোকদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা, তাদের সম্পদ হরণ করা, সম্পদকে ব্যবহার করা এবং লোকদের রক্ত শোষণ করার জন্য উপনিবেশবাদকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে অন্যদের সাথে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয়, মুসলিমদের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসা করতে হয়, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতিসমূহের মধ্যকার যুদ্ধে উস্কানি দিতে হয় যাতে অতি লাভে তাদের নিকট পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা যায়। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যে কোন ধরণের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত। তবে যদি তারা বাধ্য হয় তাহলে ধর্মকে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ, কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত আচরণকে আঁড়াল করার জন্য নৈতিক ও মানবিক বোধের কথা বলে বেড়ায়।

ব্যক্তিস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমাজগুলোকে পশুর সমাজে রূপান্তরিত করেছে। তাদের লাম্পট্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, পশুরাও এ অধঃপতিত অবস্থায় কখনও যায়নি। আইনের মাধ্যমে তারা অস্বাভাবিক ও ভ্রান্ত যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এমনসব অভ্যাস দেখা যাবে যা চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেখা যায় না। তারা দলগত যৌনাচার ও নিকটাত্মীয় এমনকি মায়ের, বোন ও মেয়ের সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তারা পশুর সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এ কারণে তাদের এমন রোগ হয়েছে যা আগে কখনওই হয়নি। তাদের সমাজে ভঙ্গুর পরিবার খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় এবং একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া এবং যে কোন ধরণের মূল্যবোধকে গ্রহণ করা ও পরিবারকে ধ্বংস করবার স্বাধীনতা। এইসব স্বাধীনতার নামে সব ধরণের পাপকাজ করা হয় এবং সব নিষিদ্ধ জিনিষকে বৈধতা দেয়া হয়।

সেকারণে স্বাধীনতার নামে ব্যভিচার, সমকামীতা, সমকামী স্ত্রীলোক, নগ্নতা ও অ্যালকোহল, যে কোন ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজকে অনুসরণ করা যে কোন ধরণের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে করা হয়।

এগুলোই হলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এগুলো হলো মানুষের প্রবৃত্তির ফসল, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর ঐশী বাণীর এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই। কোন ধর্মেরই এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। আমরা যদি গণতন্ত্রের সমর্থক ও চিন্তাবিদদের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, যা তাদের মনে একে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এবং যে পরিস্থিতিতে এর উদ্ভব ঘটেছে তা সত্যিকার অর্থেই একটি কুফর ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিছু লোকের কথার উপর ভিত্তি করে, যেমন: রাজা ১৫তম লুইসের মতে, ‘আমরা স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে মুকুট গ্রহণ করি না।’ এবং রাজা ১৪ তম লুইস বলেন, ‘রাজার কর্তৃত্ব আসে স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। স্রষ্টা হলেন এর একচেটিয়া উৎস এবং জনগণ নয়। স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে রাজাগণ তাদের কর্তৃত্বের জন্য জবাবদিহী করেন না।’ বোদ্ধাগণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো’র সামাজিক চুক্তির মতবাদকে ‘ফ্রেঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সুতরাং উপরে উল্লেখিত সবকিছু থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি ইসলামের সাথে গণতন্ত্র পুরো মাত্রায় সাংঘর্ষিক। এর উৎস যা থেকে এটি এসেছে, যে বিশ্বাস থেকে এটি উৎসারিত হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যে চিন্তা ও ব্যবস্থা এটিকে নিয়ে এসেছে তা থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

- যে উৎস থেকে এটি এসেছে সেটি হল মানুষ। তার কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে বিবেচনার জন্য, হুসন (পছন্দীয়) এবং কুবহ (তিরষ্কারযোগ্য) এর বিষয়ে সে নিজেই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটা আর কোন কিছুই নয়, বরং তার খেয়ালখুশী ও প্রবত্তির অনুসরণ। এর সৃষ্টির শেকড় হল ইউরোপের দার্শনিকগণ।

ইসলামের ক্ষেত্রে তা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি এটা নাযিল করেছেন তার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উপর। ইসলামে শাসকগণ আইন জারির ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি নয়, শারী’আহ্’র শরণাপন্ন হয়। শারী’আহ্’র বাণীসমূহকে বুঝা পর্যন্ত মনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।

- যে বিশ্বাস থেকে গণতন্ত্র উৎসারিত হয়, তা হলো জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের বিশ্বাস বা আক্বীদাহ্ এবং এটা এসেছে আপোষমূলক সমাধানের মাধ্যমে। এটা ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং জীবন ও রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাবকে বিলুপ্ত করেছে এবং সর্বোপরি মানুষকে তার নিজের ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।
ইসলামের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এতে ইসলামী আক্বীদাহ্’র আলোকে জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যকথায় ইসলামিক আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত ইসলামী শারী’আহ্ ভিত্তিক হুকুমের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত হয়। এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।

- যে ভিত্তির উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত তা হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। জনগণ হলো সকল ক্ষমতার উৎস। এর উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তিনটি শক্তির জন্ম দিয়েছে; আইন, নির্বাহী ও বিচারিক ক্ষমতা, যাতে সে এর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ করতে পারে।

ইসলামে শারী’আহ্’র উপর সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত এবং উম্মাহ্’র আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। তবে ইসলাম মুসলিমদের আল্লাহ্ প্রদত্ত আদেশ-নিষেধকে কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং শারী’আহ্গত দলিলের ভাষায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

- গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা ও চিন্তা নিয়ে এসেছে যার ভিত্তি মানুষের প্রবৃত্তিজাত এবং তা হলো লাভ। অন্যদিকে ইসলামের আইন প্রক্রিয়া শারী’আহ্ এবং শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত আইনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এটি এই নির্দেশিত পথের অনুমোদন ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল।

গণতন্ত্রের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা থেকে ইসলাম লাভবান হতে পারে; এ ধরণের উক্তি ভিত্তিহীন এবং দলিল নির্ভর নয়। আমরা গণতন্ত্রের কিছু প্রভাব দেখতে পেয়েছি যা এমন এক মন্দ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে যা কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানবতার জন্য আগত সর্বোত্তম উম্মতের গণতন্ত্র থেকে নেওয়ার কিছু নেই। ইসলামের কী এমন কোনো ঘাটতি রয়ে গেছে যে তা পূরণের জন্য গণতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ পশ্চিমা সভ্যতার ফলাফল নয়

এরকম ধারণা বিরাজমান রয়েছে যে পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন গণতন্ত্রের বাস্তবায়নের ফসল। অথচ এর পক্ষালম্বনকারীরা বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ। এর কারণ বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত আবিষ্কারসমূহ কোন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সংযুক্ত নয় বরং এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত মানুষের চিন্তাশক্তি দ্বারা কোনকিছু অর্জনের ক্ষমতা। যে কোনো পুঁজিবাদী, সমাজতান্ত্রিক বা মুসলিম ব্যক্তি যে তার মনকে মুক্তভাবে চলতে দেয় সেই এটা অর্জন করতে পারে। কোন ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার এক্ষেত্রে কোন প্রভাব নেই, যদি না বিশেষ কোন আদর্শ বিজ্ঞানকে অনুমোদন দেয় ও মানুষের মনের ব্যবহারকে বৈধতা দেয় অথবা এটি পূর্বের গীর্জার মত এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এটা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামী আদর্শ কেবলমাত্র পরীক্ষা করা ও বস্তুসমূহকে সম্পর্কে জানার বিষয়টিকেই অনুমোদন দেয়নি বরং আদর্শের সার্বভৌমত্বের রক্ষায় প্রয়োজনীয় বস্তুগত সামর্থ্য অর্জনকে বাধ্যতামূলক করেছে।

পশ্চিমারা তাদের মন্দ পণ্য আমাদের কাছে উপস্থাপন করছে, যেমনঃ গণতন্ত্র, যা আমাদের অনুসরণ করতে শারী’আহ্ নিষেধ করেছে। অন্যদিকে অন্য পণ্যসমূহ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যেমনঃ বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার, যে ব্যাপারে শারী’আহ্’র কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ ক্ষমতা অর্জনের সমস্ত উপকরণকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পশ্চিমাদের কাজ থেকে বুঝা যায় যে, তারা এসব সচেতনভাবেই করছে। অতএব কিছু কিছু ইসলামী  দলের এ ব্যাপারে অন্ধ হওয়াকে কি অনুমোদিত?

এটা পরিষ্কার যে বলে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে, সে গণতন্ত্রও বুঝেনি কিংবা ইসলামও বুঝেনি।

গণতন্ত্র, শূ’রা নয়

নিজেদেরকে জ্ঞানী বলে দাবিকারী কিছু লোক যখন বলে, ইসলামের শুরু গণতন্ত্র দিয়ে আর শেষ একনায়কতন্ত্র দিয়ে, তখন তা শুনে একজন হাসবে না কাঁদবে তা ঠিক করতে পারে না। তারা প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিম্নোক্ত আয়াতটি উল্লেখ করে:

“কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ভরসা করুন” [সূরা আলি ইমরান: ১৫৯]

আমাদের আলোচনার সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি চিন্তা নিয়ে এখনও আলোকপাত করা বাকী রয়েছে, আর তা হলো কিছু লোকের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ইসলাম দ্বারা অনুমোদিত যেহেতু কুর’আন ও সুন্নাহ্’তে শূ’রার বিষয়টি পরোক্ষভাবে এসেছে। তারা বলে গণতন্ত্র শূ’রা ছাড়া আর কিছুই নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগণের মতামতের উপর এবং ইসলামও আমাদেরকে জনগণের মতামত নিতে বলেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন,

“কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন।” [সূরা আলি ইমরান: ১৫৯]

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন,

“এবং যারা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।” [সূরা আশ শূরা: ৩৮]; এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বিভিন্ন বাস্তবিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাঁর সাহাবীদের সাথে আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেছন। যেহেতু এটা পবিত্র কুর’আনের নির্দেশনা ও রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তা অনুসরণ করেছেন সেহেতু মুসলিমদের এটা অনুসরণ করা উচিত। তারা আরও বলে শূ’রা এবং গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য হল শব্দার্থগত। অর্থ এক হলে ভিন্ন নাম কোন সমস্যা না।

আমরা জানি বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর লোকজন গণতন্ত্রের আহ্বান জানাচ্ছে। এদের মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে জেনে বুঝে প্রতারণাকারী আর আরেকটি নিষ্ঠাবান অংশ কিন্তু অজ্ঞ কারণ তারা না বুঝে গণতন্ত্রের আহ্বান করছে। এসব নিষ্ঠাবান-আন্তরিক গোষ্ঠীকে অবশ্যই এসব চিন্তাগুলো থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে নতুবা তাদের উদাহরণ হবে ঐ ব্যক্তির মতো যে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ্’র ইবাদত করে কিন্তু গুনাহ্’র ভাগীদার হয়। অনুতপ্ত হওয়া, নিয়ন্ত্রন বজায় রাখা এবং (বিশ্বাসের) প্রতিফলন ঘটানো, এগুলো নিষ্ঠাবান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য।

এ ধরণের লোকেরা এক সময় বলেছিল সমাজতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে এবং মুহম্মদ (সাঃ) তাদের ইমাম। তাহলে সেই দূর্গন্ধময় সমাজতন্ত্র যখন এখন বিলুপ্ত হয়ে গেলো, এখন তাদের উত্তর কী? একইভাবে গণতন্ত্র আজ যখন মৃত্যুর শেষ যন্ত্রনায় কাঁতড়াচ্ছে তখন এর আহ্বানকারীদের আর কী আশা আছে? এ ধরণের চিন্তা ইসলাম নয় গণতন্ত্রের কল্যাণের জন্য। তারা এর প্রতারণা উন্মোচনের বদলে একে সর্বোচ্চ চিন্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে। পায়ের নীচে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার বদলে একে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিয়ে এবং শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির আলোকে জীবন ব্যবস্থাকে রূপদান করলেই কেবল এটা সুস্পষ্ট হবে যে আমরা তাঁর হুকুমকে সঠিকভাবে অনুবাধন করেছি। এটা এমন একটি দলের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব যারা সঠিক জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত এবং প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সচেতন, এবং বিশ্বাসের দিক থেকে আলোকিত, শারী’আহ্ হুকুমের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং সকল ভিন্ন প্রকৃতির চিন্তা-চেতনা ও বিজাতীয় ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ বর্জনকারী। এরা বাস্তবতার কাছে কখনও মাথা নত করে না এবং পরিস্থিতির প্রভাবমুক্ত থাকে।


Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'